২০১৯ এর শুরুর দিক থেকেই আমরা এমন রিউমর শুনে আসছি যে, গুগল তাদের নিজেদের চিপসেট তৈরি করার পরিকল্পনা করছে, যেগুলো তারা তাদের ভবিষ্যতের পিক্সেল স্মার্টফোনগুলোতে ব্যাবহার করবে। যদিও এরপরের ৩ বছরে গুগলের নিজের তৈরি ফুল ফিচারড চিপসেটের কোন ওয়ার্কিং মডেল বা প্রোটোটাইপ ইউজাররা দেখতে পান নি, তবে গুগল এই তিন বছরে বেশ কিছু কাস্টম ডিজাইনড চিপ তৈরি করেছে। যেমন- পিক্সেল ভিজুয়াল কোর, টাইটান এম সিকিউরিটি চিপ, নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট ইত্যাদি।

কিন্তু সেগুলো ছিলো শুধুই কয়েকটি সাপোর্টিং চিপসেট যেগুলো তাদের ফোনগুলোতে কিছু স্পেশাল ফিচার আনার জন্য স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরের পাশাপাশি ব্যাবহার করা হয়েছিলো। তবে আগামীতে রিলিজ হতে যাওয়া পিক্সেল ফোনগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন হবেনা। গুগল এবার সত্যিকারেই তাদের নিজেদের ইন-হাউজ চিপসেট তৈরি করছে যেটি পিক্সেল ফোনে ব্যাবহার করা হবে।

গুগলের প্রথম তৈরি এই চিপসেটের নাম দেওয়া হয়েছে হোয়াইটচ্যাপেল চিপ (GS-101)। গুগল মুলত তাদের নিজেদের এই চিপসেট লঞ্চ করছে গুগলের এ১৪ বায়োনিক চিপ এবং স্ন্যাপড্রাগন ৮৮৮ চিপসেটের কম্পিটেটর হিসেবে। যাইহোক, চলুন জানা যাক, গুগলের এই নতুন চিপসেটে কি কি থাকছে এবং কিভাবে এটিকে তৈরি করছে গুগল।

এই আর্টিকেলের বিষয়বস্তু সমূহ

সিপিইউ

একটি সিস্টেম অন চিপের সবথেকে ইম্পরট্যান্ট অংশটি হচ্ছে এর সিপিইউ। সিপিইউ এর কথা শুরু করার আগে, জেনে রাখা ভালো, গুগল এই চিপসেটটি তৈরি করছে স্যামসাং এর সাথে পার্টনারশিপে। স্যামসাং এর যে ডিপার্টমেন্ট তাদের ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোনগুলোর জন্য এক্সিনস চিপসেট তৈরি করে, সেই ডিপার্টমেন্টটিই গুগলের সাথে কাজ করছে তাদের ইন-হাউজ চিপসেট তৈরির কাজে। গুগল মুলত তাদের চিপ ডিজাইনের ক্ষেত্রে স্যামসাং এর কিছু IP (Intellectual Property) ব্যাবহার করছে যার ফলে তারা স্যামসাং এর সহায়তায় একটি ৫ ন্যানোমিটার টেকনোলজির চিপসেট তৈরি করতে পারছে।

কোর কাউন্টের কথা বলতে গেলে গুগলের প্রথম হোয়াইটচ্যাপেল চিপসেটটিতে থাকবে একটি অক্টাকোর প্রসেসর। প্রসেসরটিতে থাকবে একটি সিংগেল হাই ফ্রিকুয়েন্সির এ৭৮ কোর এবং তিনটি লো ফ্রিকুয়েন্সির এ৭৮ কোর। এছাড়াও থাকবে চারটি এ৫৫ কোর, যেগুলো ব্যাবহার করা হবে পাওয়ার এফিশিয়েন্ট টাস্কগুলো হ্যান্ডেল করার জন্য। প্রথম চিপসেটটির ক্ষেত্রে গুগলের লক্ষ্য হবে একইসাথে একটি ডিসেন্টলি পাওয়ারফুল এবং ব্যাটারি এফিশিয়েন্ট চিপসেট তৈরি করা।

পারফরমেন্স

যারা গুগলের নতুন চিপসেট সম্পরকে রিউমর শুনেছেন, তারা হয়তো গুগলের তৈরি নিজের চিপসেট শুনে ধারণা করেছেন যে এটি হতে চলেছে সবথেকে পাওয়ারফুল চিপসেটগুলোর একটা। কিন্তু না, ব্যাপারটা একেবারেই তেমন না। গুগল তাদের এই নতুন চিপসেটটি সবথেকে পাওয়ারফুল চিপসেট হিসেবে তৈরি করছে না। অর্থাৎ এটি থেকে খুব ভালো পারফরমেন্স পাওয়া গেলেও অন্যান্য যেকোনো ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোনের থেকে বেটার পারফরমেন্স আশা করা ভুল হবে। যদি স্ন্যাপড্রাগনের সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে গুগলের প্রথম হোয়াইটচ্যাপেল চিপসেটটি হবে কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন ৮৭০ প্রোসেসরের সমতুল্য যা স্ন্যাপড্রাগন ৮৮৮ এর তুলনায় কিছুটা লো পাওয়ারড।

 

তবে আপার মিডরেঞ্জ চিপসেটের ক্যটাগরিতে পড়লেও এটির থেকে প্রায় ফ্ল্যাগশিপ লেভেরই পারফর্মেন্স পাওয়া যায়। তবে অবশ্যই গুগলের প্রথম হোয়াইটচ্যাপেল চিপসেটটি স্ন্যাপড্রাগন ৮৮৮ এর মতো পাওয়ারফুল হবেনা। গুগল মুলত এই চিপসেটটির ব্যাটারি এফিশিয়েন্সি এবং অন্যান্য সেক্টরে বেশি ফোকাস করছে। তবে রেগুলার টাস্ক এবং ইন্টেনসিভ গেমিং এর জন্যেও এই চিপসেটটি যথেষ্ট পাওয়ারফুল হবে বলে আশা করা যায়।

জিপিইউ

সিপিইউ এবং পারফরমেন্সের পরে এবার আসা যাক এই চিপসেটের জিপিইউ পাওয়ারের ব্যাপারে। XDA Developer এর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গুগলের প্রথম হোয়াইটচ্যাপেল চিপসেটে থাকবে Mali G-78 GPU যা স্যামসাং এর লেটেস্ট ফ্ল্যাগশিপ ডিভাইস, গ্যালাক্সি এস ২১ আলট্রাতেও ব্যাবহার করা হয়েছে। সিপিইউ এর ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও জিপিইউ এর ক্ষেত্রে একেবারেই পিছিয়ে নেই গুগল। তাই গুগলের নতুন চিপসেটটি নিয়ে গেমাররা নিশ্চিন্তে থাকবেন, এমনটাই আশা করা যায়। তাছাড়া, গুগল যেহেতু আগামীতে রিলিজ হওয়া পিক্সেল ফোনগুলোতে ১২০ হার্জ রিফ্রেশ রেটের অ্যামোলেড ডিসপ্লে ব্যাবহার করবে, তাই সেক্ষেত্রে হাই এন্ড জিপিইউ এর দরকার থেকেই যায়।

আর হাই এন্ড জিপিইউ ব্যাবহারের পাশাপাশি গুগল তাদের চিপসেটটিকে গেমিং এর জন্য অপটিমাইজও করবে যাতে গেমাররা স্পেশালি তাদের চিপসেট থেকে বেস্ট গেমিং পারফরমেন্স পেতে পারেন। Mali G-78 জিপিইউ সর্বোচ্চ ২৮ টি কোর ব্যাবহার করতে পারে। তবে স্যামসাং এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ এই জিপিইউতে ১৪ টি কোর ইমপ্লিমেন্ট করেছে। তবে গুগল বেটার গেমিং এবং গ্রাফিক্স পারফরমেন্সের জন্য জিপিইউ এর কোর সংখ্যা বাড়াতে পারে। তবে এব্যাপারে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে গুগল কিছুই জানায়নি।

৫জি মডেম

২০২১ সালে ম্যানুফ্যাকচার করা একটি চিপসেটে ৫জি সাপোর্ট থাকবেনা, এমনটা হতেই পারেনা। গুগলের হোয়াটচ্যাপেল চিপসেটে থাকবে স্যামসাং এর তৈরী ইন-হাউজ ৫জি মডেম, যার কোডনেম Shanon। স্যামসাং এর এই ৫জি মডেমটি মিলিমিটার ওয়েভ এবং সাব ৬ গিগাহার্জ দুই ধরনের ৫জি ব্যান্ডই সাপোর্ট করবে। আর এই চিপসেটে রান করা ডিভাইস সর্বোচ্চ ৫.১ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড পর্যন্ত স্পিড সাপোর্ট করবে। তবে ধারনা করা হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে গুগল লিগ্যাল ইস্যুর কারণে কোয়ালকমের এক্স৫৫ মডেমটি ব্যাবহার করতে বাধ্য হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোতে হোয়াইটচ্যাপেল চিপসেটে নিশ্চিতভাবেই স্যামসাং এর ইন-হাউজ ৫জি মডেমটি ব্যাবহার করতে দেখ যাবে।

এআই এবং ম্যাশিন লার্নিং

যেমনটা ইতমধ্যেই ধারণা করেছেন, গুগলের এই নতুন ইন-হাউজ চিপসেটের সবথেকে বড় ফোকাসটাই হতে চলেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ম্যাশিন লার্নিং ফিচারস। অবশ্যই, বর্তমানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ম্যাশিন লার্নিং এর ক্ষেত্রে পৃথিবীর সবথেকে অ্যাডভানসড কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে গুগল। আমরা ইতোমধ্যেই জানি যে কোয়ালকম প্রসেসরগুলো যথেষ্ট ভালো এআই পারফরমেন্স দিতে সক্ষম। স্ন্যাপড্রাগন ৮৮৮ প্রোসেসর এআই এবং ম্যাশিন লার্নিং এর ক্ষেত্রে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৬ ট্রিলিয়নেরও বেশি অপারেশন করতে সক্ষম।

স্যামসাং এর ফ্ল্যাহশিপ এক্সিনস চিপসেটগুলোও এর নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট ব্যাবহার করে এমন অবিশ্বাস্যরকম পারফরমেন্স দিতে পারে। তবে যতদুর জানা যায়, গুগলের হোয়াইটচ্যাপেল চিপসেটের এআই পারফরমেন্স অন পেপার স্যামসাং বা কোয়ালকোমের মতো এত হাই এন্ড হবে না। রিউমরস অনুযায়ী, গুগলের আপকামিং হোয়াইটচ্যাপেল চিপসেট সর্বোচ্চ প্রতি সেকেন্ডে ৫.৭ ট্রিলিয়ন অপারেশন সাপোর্ট করে। তবে গুগলের ক্ষেত্রে চিপসেটের বেস এআই পারফর্মেন্সই একমাত্র ফ্যাক্টর নয়।

গুগল আরও অনেক আগেই তাদের ডিভাইসগুলোতে ইমেজ প্রসেসিং এবং পিক্সেল নিউরাল কোরের জন্য কাস্টম চিপ ডিজাইন করেছে। পিক্সেল নিউরাল কোর এবং পিক্সেল ভিজুয়াল কোর হচ্ছে গুগলের সবথেকে বেশি ব্যাবহার করা দুটি ম্যাশিন লার্নিং চিপসেট যা গুগল ইন্টেলের সহায়তায় তৈরি করেছে। খুব সম্ভবত, গুগলের হোয়াইটচ্যাপেল চিপসেটে বিল্ট ইন এআই এবং ম্যাশিন লার্নিং ক্যাপেবলিটিস এর পাশাপাশি গুগলের এক্সিস্টিং এই চিপসেটগুলোরও ইন্টিগ্রেশন দেখা যেতে পারে।

হোয়াটচ্যাপেল চিপসেটের সাথে গুগলের এক্সিস্টিং এআই চিপসেটগুলো ইন্টিগ্রেট করা হলে সব মিলিয়ে অন্যান্য হাই এন্ড প্রসেসরের তুলনায় গুগলের চিপসেটের এআই পারফরমেন্স অনেক বেশি অপটিমাইজড এবং আরও বেশি কার্যকর হবে এমনটাই আশা করা যায়। যেহেতু, এক্ষেত্রে তাদের সাপোর্টিং এআই চিপের পাশাপাশি মেইন সিস্টেম অন চিপটির ওপরেও গুগলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রন থাকতে চলেছে।

গুগল কেন নিজেদের চিপসেট তৈরি করছে?

এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, গুগল তো বেশ কয়েকবছর ধরে স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরের সাথে তাদের পিক্সেল ফোন রিলিজ করে বেশ সফলতার সাথেই স্মার্টফোন মার্কেটে বিজনেস করে আসছিল। তাহলে কেনই বা তারা এত অর্থ এবং লোকবল বিনিয়োগ করছে তাদের নিজেদের ইন-হাউজ স্মার্টফোন চিপসেট তৈরিতে? এর কারণ হচ্ছে ইউজার এক্সপেরিয়েন্স বেটার করা। গুগলের ফোনে স্ন্যাপড্রাগন চিপসেট ব্যাবহার করলে ফোনের সফটওয়্যার আর ফোন ডিজাইন/বিল্ট কোয়ালিটি ছাড়া ফোনের হার্ডওয়্যারের ওপরে গুগলের খুব বেশি কনট্রোল থাকেনা। যদি গুগল ফোনের সফটওয়্যারের পাশাপাশি ফোনের সবথেকে ইম্পরট্যান্ট হার্ডওয়্যারটিও নিজেরা নিজেদের তত্ত্বাবধায়নে তৈরি করতে পারে, তাহলে তাদের প্রত্যেকটি ফোনের হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার দুই ক্ষেত্রেই গুগলের আগের থেকে অনেক বেশি কনট্রোল থাকবে।

এর ফলে তারা ফোনগুলোকে বেটার ইউজার এক্সপেরিয়েনক্সের জন্য আরও ভালোভাবে অপটিমাইজ করার সুযোগ পাবে। এর এর আরেকটা কারণ হচ্ছে রেগুলার আপডেট। কোয়ালকম এর বোর্ড প্যাকেজগুলোকে শুধুমাত্র ৩ বছর পর্যন্ত অফিসিয়ালি সাপোর্ট করে। এর ফলে গুগল তাদের পিক্সেল ফোনে রেগুলার আপডেটের প্রতিশ্রুতি দিলেও ৩ বছর পরেও একটি ফোনে আপডেট পুশ করা এবং আপডেটের পরেও ইউজার এক্সপেরিয়েন্স ভালো রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া গুগলের জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। গুগল যদি তাদের আপকামিং সব পিক্সেল ফোনে নিজেদের চিপসেট ব্যাবহার করে, তাহলে গুগলকে আর কখনোই আপডেট পুশ করার জন্য কোয়ালকমের ওপরে নির্ভরশীল হতে হবেনা। মুলত এই দুটি কারণ ছাড়াও আরও অনেক কারণেই গুগল সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের ইন-হাউজ চিপসেট ডেভেলপ করার।


 

This content is from WIREBD.