ম্যাসেজটি পড়া হয়েছে কিনা, মেসেঞ্জার অ্যাপ সেটা কিভাবে বুঝতে পারে?

 

এই আর্টিকেলটি লিখতে বসে মনে পরে গেলো ছোটবেলার কথা। ক্লাস ৩/৪ থেকেই আত্মীয়দের চিঠি লিখতাম, পরে মামা বাসায় বেড়তে আসলে শুনি তারা নাকি বেশ কিছু চিঠি পান নি, যেগুলো আপনি সেন্ড করেছিলাম। পরে শুনি, ওদের পোস্ট অফিসের নাম পরিবর্তন হয়েছে, তাই আমার একটাও চিঠি তারা পান নি। ছোটবেলায় মনে বিরাট একটা প্রশ্ন ছিল, ডেলিভারি না হওয়া এই চিঠি গুলো আসলে যেতো কোথায়? — পরে একবার কার যেন মুখে শুনেছিলাম এগুলোকে পুরিয়ে দেওয়া হতো।

যাইহোক, আমাদের দেশের পোস্টাল সার্ভিসের গল্প শুনিয়ে আর সময় নষ্ট না করি। সৌভাগ্যবশত, মডার্ন ম্যাসেজিং অ্যাপ গুলো ঠিকঠাক মতোই ডেলিভারি রিপোর্ট সেন্ড করে, ফলে আপনি সহজেই বুঝতে পারেন আপনার পাঠানো বার্তাটি কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির কাছে পৌঁছালো কিনা। আবার ম্যাসেজটি পড়লো কিনা সেই রিপোর্টও আপনার কাছে চলে আসে… কিন্তু এই সিস্টেম কাজ করে কিভাবে?

হ্যাঁ, লম্বা চিঠি লেখার পরে না পৌঁছানোর কষ্ট আমার মতো হয়তো আর আপনাদের ভোগ করতে হয় না, মডার্ন এই টেকনোলজি আমাদের মদ্ধে কি কি মডার্ন চাপ তৈরি করেছে সেগুলোও কি একবার ভেবে দেখেছেন? — চলুন, আলোচনা করা যাক…

সিন?

ধরুন, আপনার কোন বন্ধু আপনাকে বারবার ম্যাসেজ সেন্ড করছেন কিন্তু আপনি রিপ্লাই দিতে চান না বা বিরক্ত বোধ করছেন, তাই ইগ্নোর করছেন। কিন্তু হঠাৎ করে চাপ লেগে নোটিফিকেশন থেকে ম্যাসেজটি ওপেন হয়ে গেলো আর সাথে সাথে আপনার বন্ধুটি কিন্তু যেনে গেলো আপনি ফোনের কাছেই রয়েছেন আর ম্যাসেজটি সিনও করলেন। — রিপ্লাই করার কোন ইচ্ছা না থাকা শর্তেও এবার কিন্তু আপনাকে রিপ্লাই করতে হবে, আর এবার আপনি পরে গেলেন এক মহা চাপের মদ্ধে! — এমনটা কি আপনার সাথে কখনো হয়েছিলো? ওয়েল, জানা মতে আমাদের সকলের সাথেই আজকাল এমনটা হয়ে থাকে।

ম্যাসেজটি পড়া হয়েছে কিনা, মেসেঞ্জার অ্যাপ সেটা কিভাবে বুঝতে পারে?

আপনার ক্রাশকে ম্যাসেজ সেন্ড করলেন, তিনি ম্যাসেজটি সিনও করলেন, কিন্তু… “কোন উত্তর নেই 🙁 ” কষ্ট তো ঐখানেই, আপনি জানতে পারলেন সে ম্যাসেজটি রিড করেছে, যদি এটা না জানতেন, কষ্ট কিছুটা হলেও কমে যেতো। তবে আমি এখানে আপনার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে আলোচনা করতে বসিনি। কিন্তু এই সব নষ্টের গোঁড়া “Seen” কিভাবে কাজ করে?

রিড রিসিট (Read Receipt)

টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, বা ফেসবুক মেসেঞ্জার জন্মেরও আগে পোস্টাল সার্ভিস গুলো চিঠি ডেলিভারি করার পরে একটা রিটার্ন রিসিট রেখে দিত, এতে তারা সহজেই ট্র্যাক করতে পারতো চিঠিটি ঠিকঠাক মতো ডেলিভারি হয়েছে কিনা। ছোটবেলায় বাংলা সাদাকালো সিনেমায় দেখতাম পিয়ন এসে কাউকে চিঠি দিয়ে একটা কাগজে সই করিয়ে নিয়ে যেতো। তারপরে ঐ রিসিট সেন্ড করে দেওয়া হয় যে চিঠিটি পাঠিয়েছিলো তাকে, সে সহজেই জানতে পারে টার চিঠি বা প্যাকেজটি ডেলিভারি হয়েছে কিনা। তবে যতদূর মনে পরে চিঠি রেজিস্টার না করলে এই সুবিধাটি পাওয়া যেতো না।

প্রযুক্তির বদৌলতে আমরা আর কেউই চিঠি আদান প্রদান করি না, অন্তত পার্সোনাল কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে। আর ইন্টারনেটের সাহায্যে যেহেতু সহজেই তথ্য দেওয়া নেওয়া করা যায়, তাই মডার্ন কমিউনিকেশন গুলো ইন্টারনেটের মাদ্ধমেই সম্পূর্ণ করা হয়ে থাকে।

যদি কথা বলি, ইমেইল বা মডার্ন ম্যাসেজিং সার্ভিস গুলো নিয়ে, তবে সেগুলো চিঠি লেখার তুলনায় কোটি গুন বেশি দ্রুতগামী এবং নির্ভরযোগ্য। ডেভেলপারগন, পোস্টাল সার্ভিসের সিমিলার সিস্টেমে ইমেইল ম্যাসেজ বা ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজ এবং ডেলিভারি রিপোর্ট নিশ্চিত করেন। মূলত, ডেলিভারি স্ট্যাটাস নোটিফিকেশন (Delivery Status Notification) বা DSN এবং ম্যাসেজ ডিস্পজিশন নোটিফিকেশন (Message Disposition Notification) বা MDN এর মাদ্ধমে ডেলিভারি নোটিফিকেশন সিস্টেম এবং রিড রিসিট নিয়ন্ত্রন করা হয়।

সংক্ষেপে DSN এর মাদ্ধমে এটা নিশ্চিত করা হয়ে থাকে ম্যাসেজটি ঠিকঠাক মতো ডেলিভারি হলো কিনা এবং MDN এর মাদ্ধমে নিশ্চিত করা হয় ম্যাসেজটি খোলা হয়েছে কিনা। মডার্ন ম্যাসেজিং অ্যাপ গুলোতে কোন ম্যাসেজ সেন্ড বা রিসিভ করতে মাঝখানে সার্ভার কাজ করে। হ্যাঁ অবশ্যই দুনিয়ার সকল ম্যাসেজিং অ্যাপ গুলো একই মডেল এ কাজ করে না, তাদের আলাদা সিস্টেম থাকে।

তবে আপনি যখন কাউকে কোন ম্যাসেজ সেন্ড করেন, সেটা আগে সার্ভারে গিয়ে পৌঁছায়। সার্ভার সাথে সাথে আপনাকে জানিয়ে দেয় যে ম্যাসেজটি সেন্ট হয়েছে। তারপরে সার্ভার রিসিপিয়েন্ট আইডি অনুসারে ম্যাসেজটি প্রাপকের কাছে পাঠানোর চেস্টা করে। প্রাপকের ইন্টারনেট কানেকশন ঠিক থাকলে ম্যাসেজটি তার মেসেঞ্জারে ভেসে উঠে। প্রাপকের অ্যাপ থেকে সার্ভারে নোটিফিকেশন যায় যে ম্যাসেজটি সে পেয়েছে। তারপরে সার্ভার আপনাকে জানিয়ে দেয় ম্যাসেজটি ডেলিভারি করা হয়ে গেছে। এরপরে প্রাপক ম্যাসেজটি ওপেন করলে বা সিন করলে বা রিড করলে আবার তার অ্যাপ থেকে সার্ভারের কাছে সিগন্যাল যায় যে ম্যাসেজটি খোলা হয়েছে। তারপরে সার্ভার আপনাকে জানিয়ে দেয় ম্যাসেজটি সিন হয়েছে!

মডার্ন ম্যাসেজিং অ্যাপ গুলোতে আরো অনেক রকমের স্ট্যাটাস দেখতে পাওয়া যায়। যেমন, আপনি কারো সাথে চ্যাট করার সময় সে লিখছে কিনা সেটাও বুঝতে পারেন। এই অ্যাপ গুলো কেবল ম্যাসেজ সেন্ট করার সময়ই ডাটা সেন্ড করে না বরং সবসময়ই নানান ডাটা সার্ভারের কাছে সেন্ড করতেই থাকে। আর এভাবেই রিড রিসিট সিস্টেম পারফেক্ট ভাবে কাজ করতে পারে।

ম্যাসেজ সিন করা নিয়ে যতো অশান্তি

ছোটবেলায় যখন বিশাল কোন আবদারে ভরা চিঠি মামাদের সেন্ড করতাম আর পরে জানতে পারতাম সেটা গিয়ে পৌঁছায়ই নি, এর থেকে দুঃখের ব্যাপার আর কিছু ছিল না সেই সময়ের জন্য। সেই তুলনায় মডার্ন ম্যাসেজিং অ্যাপ গুলোর ডেলিভারি রিপোর্ট আর রিড রিসিট অনেক কাজের ফিচার। আপনি ইনস্ট্যান্ট সবকিছু যেনে যাচ্ছেন। কিন্তু এর সাথে চলে আসে নানান ইউনিক টাইপের চাপ যেগুলো আগে আমাদের ফেস করতে হতো না।

কারো ম্যাসেজ খোলার পরে সেটা দেরিতে রিপ্লাই করলে বা একেবারে রিপ্লাই ই না করলে ব্যাক্তি ভেদে নানান সোশ্যাল প্রেসার তৈরি হতে পারে, যেটা আপনার জিবনের কোন না কোন অংশকে আঘাত করবে। তাছাড়া আপনি কোন ম্যাসেজ কখন দেখবেন আর কখন রিপ্লাই করবেন সেটা আপনার একান্ত ব্যাক্তিগত ব্যাপার। যদি আপনি কখন ম্যাসেজ পড়ছেন সেটা অন্য কেউ জানতে পারে এটা মারাত্তক ধরণের এক প্রাইভেসি ইস্যু।

সৌভাগ্যবশত কিছু ম্যাসেজিং অ্যাপ যেমন হোয়াটসঅ্যাপ বা ভাইবার আপনাকে রিড রিসিট বন্ধ করার সুবিধা প্রদান করে থাকে, কিন্তু এর উল্টা ইফেক্টও রয়েছে। রিড রিসিট অফ করা থাকলে অবশ্যই আপনি কোন ম্যাসেজ পড়লে সেটা সেন্ডারকে নোটিফাই করা হবে না, কিন্তু উল্টে আপনিও দেখতে পাবেন না আপনার সেন্ড করা ম্যাসেজটি সিন হলো কিনা। আর তাছাড়া অনেক জনপ্রিয় ম্যাসেজিং অ্যাপে এখনো রিড রিসিট অফ করার অফিশিয়াল উপায় নেই। যেমন, ফেসবুক মেসেঞ্জারে আপনি রিড রিসিট অফ করতে পারবেন না। মানুষ নানান তৃতীয়পক্ষ এক্সটেনশন ব্যবহার করে রিড রিসিট অফ করে থাকে, তবে সেটা শুধু ডেক্সটপ ব্রাউজারে কাজ করে বা মোবাইল ব্রাউজারে বা আলাদা মডিফাই করা অ্যাপে, আসল অ্যাপে কাজ করে না।


রিড রিসিট ভালো জিনিস। আমরা সর্বদায় জানতে পছন্দ করি আমাদের সেন্ড করা ম্যাসেজ কেউ পড়লো, কিনা পড়লো না। এক্ষেত্রে আপনি যদি প্রাইভেসি রক্ষা করতে যান সহজেই অনেক কিছুর উপর থেকে কন্ট্রোল হারাবেন আর কন্ট্রোল করতে চাইলে প্রাইভেসি। প্রত্যেকের ক্ষেত্রে অবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে, কিন্তু ম্যাসেজ সিন ফিচারটি যে অনেক বিড়ম্বনা আর চাপ তৈরি করতে পারে এটা নিশ্চিত। হিউম্যান সাইকোলজি নিয়ে আমার খুব একটা জ্ঞান নেই, তাই সহজ ভাষায় এগুলো বুঝানো আমার জন্য মুশকিল। আশা করছি পুরো আর্টিকেলটির সারমর্ম এতক্ষণে বুঝে গেছেন, আর সাথে তো জানলেনই, ম্যাসেজ পড়ার পরে কিভাবে সেটা মেসেঞ্জার অ্যাপ গুলো জানতে পারে!